নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার পানিশা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিদ্যালয় পরিচালনায় অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা, আর্থিক অনিয়ম, বিদ্যালয়ের সম্পদ ব্যবহারে অনুমোদন না নেওয়া এবং শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৩০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত পানিশা উচ্চ বিদ্যালয়টি একসময় আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করলেও বর্তমানে বিদ্যালয়টি নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থী উপস্থিতি ও ভর্তি সংখ্যা কমে যাওয়ায় বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।
অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টির নিয়মিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৬ জন। তাদের মধ্যে ৪ জন অকৃতকার্য হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয় পরিচালনায় স্থানীয় অভিভাবক ও গ্রামবাসীদের সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় না থাকা, শিক্ষার মান নিয়ে উদাসীনতা এবং বিদ্যালয়ে কার্যকর পাঠদানের পরিবেশ না থাকাকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দাবি করছেন তারা।
প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকেন না এবং নির্ধারিত সময়ে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করেন না। কোনো কোনো দিন দুপুর ১২টা বা ১টার দিকে বিদ্যালয়ে আসার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। এমনকি কোনো কোনো মাসে মাত্র এক-দুই দিন বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রধান শিক্ষকের যথাযথ তদারকির অভাবে অন্যান্য শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতি ও শ্রেণিকক্ষে পাঠদানেও শৃঙ্খলা নষ্ট হয়েছে। ফলে বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
বিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সময়ে পাওয়া অনুদান এবং বিদ্যালয়ের সম্পদ বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থের যথাযথ হিসাব সংরক্ষণ করা হয় না। সম্প্রতি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের কয়েকটি বড় ও মূল্যবান গাছ অনুমোদন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া কেটে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এর আগেও বিদ্যালয়ের বিভিন্ন গাছ বিক্রির অর্থের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
এছাড়া প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অতীতে এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ ওঠার পর মামলা ও পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনার কথাও স্থানীয়দের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট মামলা, প্রশাসনিক নথি এবং বিদ্যালয়ের রেকর্ড যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
বিদ্যালয়ের অন্যতম অংশীজন হিসেবে অভিভাবক ও গ্রামবাসীদের সঙ্গে সমন্বয় না করার অভিযোগও রয়েছে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও শিক্ষার মানোন্নয়নের বিষয়ে তারা বিভিন্ন সময় পরামর্শ দিতে চাইলেও তাদের সঙ্গে যথাযথভাবে আলোচনা করা হয়নি। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রামবাসীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও করেছেন তারা।
এদিকে, অভিযোগকারীরা প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের আর্থিক হিসাব, অনুদানের অর্থের ব্যবহার, গাছ ও অন্যান্য সম্পদ বিক্রির হিসাব, শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতি, পাঠদানের মান এবং পূর্বের অভিযোগ ও মামলার নথি যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর ভাষ্য, তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তাদের দাবি, বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে এনে প্রতিষ্ঠানটির হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তবে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য এই প্রতিবেদনের প্রকাশের আগে পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।