বাগেরহাটের মোংলায় এক জেলের রহস্যজনক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কোস্টগার্ড সদস্যদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় কোস্টগার্ডের একটি স্টেশনে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কোস্টগার্ড ফাঁকা গুলি ছুড়লে এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সকাল থেকে মোংলা উপজেলার জয়মনি ঠোঁটা ও সংলগ্ন হারবারিয়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে কোস্টগার্ডের কয়েকজন সদস্য আহত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যেও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, জয়মনির ঘোল এলাকার বাসিন্দা মিরাজ শেখ (৩০) প্রায় দুই মাস ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। পরিবারের দাবি, তাকে কোস্টগার্ড সদস্যরা নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে তাকে আটক বা গ্রেপ্তারের কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
মিরাজের সন্ধানের দাবিতে গত মঙ্গলবার কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয় এবং তাদের ব্যানার-ফেস্টুন সরিয়ে নেওয়া হয়।
এর ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার সকালে মিরাজের মা, স্ত্রী, বোন ও শাশুড়িসহ কয়েকজন স্বজন হারবারিয়ায় অবস্থিত কোস্টগার্ড স্টেশনে গিয়ে তার অবস্থান সম্পর্কে জানতে চান। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, তারা স্টেশনের পন্টুনে অবস্থান নিলে কোস্টগার্ড সদস্যরা তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে নৌকা ও ট্রলারযোগে বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষ ঘটনাস্থলে জড়ো হন। পরে একদল লোক কোস্টগার্ড স্টেশন ও একটি স্পিডবোটে ভাঙচুর চালায়। এ সময় স্টেশনে থাকা সিসিটিভি সরঞ্জামের কিছু অংশও নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কোস্টগার্ডের অতিরিক্ত সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফাঁকা গুলি ছোড়ে। পরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোস্টগার্ড সদস্যরা তীরে উঠে কয়েকটি বাড়িতে প্রবেশ করে বাসিন্দাদের মারধর করেন। এতে অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন আহত হন বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া মিরাজের মা, স্ত্রী ও বোনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে দেখা যায়, লাঠিসোঁটা ও ঝাড়ু হাতে একদল নারী-পুরুষ নৌকাযোগে কোস্টগার্ড স্টেশনের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। পরে স্টেশনের বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর চালানো হয়। ভিডিওতে কোস্টগার্ড সদস্যদের ফাঁকা গুলি ছুড়তেও দেখা যায়। আরেকটি ভিডিওতে নদীর তীরে কয়েকজনকে মারধরের দৃশ্যও উঠে এসেছে।
মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমিন আক্তার সুমী জানান, ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাব ও কোস্টগার্ড সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, হামলার মুখে আত্মরক্ষার্থে তারা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
অন্যদিকে কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে, স্থানীয় গ্রামবাসী নয়, বরং একটি সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্ত চক্র পরিকল্পিতভাবে স্টেশনে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে। এতে কয়েকজন কোস্টগার্ড সদস্য আহত হয়েছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সুন্দরবনসংলগ্ন জয়মনির ঘোল এলাকা দীর্ঘদিন ধরে বনদস্যু ও তাদের সহযোগীদের সক্রিয় ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এসব অপরাধী চক্রের রসদ ও লজিস্টিক সরবরাহ বন্ধ করতে ওই এলাকায় কোস্টগার্ড স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। ফলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল কোস্টগার্ডকে এলাকা থেকে সরিয়ে দিতে নানা অপপ্রচার ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলে দাবি করা হয়।
ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে যৌথ তদন্ত ও অভিযানের কথা জানিয়েছে কোস্টগার্ড। একই সঙ্গে হামলা ও ভাঙচুরে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।