হিমালয়ের কোলে নেপাল-চীন সীমান্তসংলগ্ন রাসুয়া জেলায় বরফ ও পাথরের বিশাল ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে। গত বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালের এই ভয়াবহ বিপর্যয়ে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ২৮৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরও কয়েকশ মানুষ। পাহাড়ি ঢলে নদীপাড়ের একের পর এক বসতি, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এবং একাধিক সেতু ভেসে গেছে।
বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক তথ্যমতে, লাংটাং লিরুং পর্বতের নেপাল অংশে সংঘটিত বিশাল একটি তুষারধসই এই ধ্বংসলীলার মূল কারণ। জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের ধারণা, তুষারধসের বিপুল ধ্বংসাবশেষ নিচে নেমে এসে ভোটেকোশি নদীর অন্যতম উপনদী ‘লেন্দে’-র প্রবাহ আটকে দেয়। এতে সেখানে একটি অস্থায়ী ল্যান্ডস্লাইড ড্যাম বা প্রতিবন্ধক হ্রদের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে পানির তীব্র চাপে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে কাদামাটি, পাথর ও বরফমিশ্রিত প্রবল স্রোত নিচের দিকে ধেয়ে আসে। নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘আইসিআইএমওডি’ (ICIMOD)-র স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণেও একই চিত্র দেখা গেছে।
ভয়াবহ এই পানির ধাক্কায় নিমেষেই প্লাবিত হয় রাসুয়া, নুওয়াকোট, ধাদিং, চিতওয়ান, তানাহুন, গোরখা ও নওয়ালপরাসি ইস্ট জেলা। নুওয়াকোট জেলা প্রশাসন একে ওই অঞ্চলের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা বলে অভিহিত করেছে। আইসিআইএমওডি-র উপাত্ত অনুযায়ী, পানির বেগ এতটাই অস্বাভাবিক ছিল যে গালছিতে ত্রিশূলী নদীর পানি মাত্র ৩০ মিনিটে ৯ মিটার এবং মালেখুতে প্রায় ৭ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়।
দুর্ঘটনার প্রায় একই সময়ে (সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে) তিব্বত সীমান্তে ৪.৪ মাত্রার একটি মৃদু ভূমিকম্প রেকর্ড করে ইউএসজিএস (USGS)। ভূমিকম্পটি তুষারধসের সূত্রপাত ঘটাতে সরাসরি প্রভাব ফেলেছিল কি না, তা নিয়ে বর্তমানে গবেষণা চালাচ্ছেন কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানীরা।
সামনে নতুন ঝুঁকিতে নদীপাড়ের মানুষ, একটি বিপর্যয়ের ক্ষত না শুকাতেই চীনের তিবেত অংশ থেকে এসেছে নতুন উদ্বেগের খবর। চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তিব্বতে ছটচেন ও পুরুপে নদীর মিলনস্থলে ধসের কারণে আরেকটি বিশাল ‘বাধা হ্রদ’ (Barrier Lake) তৈরি হয়েছে, যেখানে ইতোমধ্যে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমা হয়েছে। আগামী কয়েক দিনে এতে আরও ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই অস্থায়ী বাঁধটি ভেঙে গেলে নদী দুটি বেয়ে নেপালের ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী অববাহিকায় আবারও ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে।
নেপালের হিমালয় অঞ্চলে আগে থেকেই ২১টি হিমবাহ-সৃষ্ট বিপজ্জনক হ্রদ চিহ্নিত ছিল। তবে বুধবারের তুষারধস বা নদী আটকে যাওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো আগাম পূর্বাভাস ছিল না। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমালয়ে বরফ গলার গতি বাড়ায় ভবিষ্যতে এ জাতীয় প্রাকৃতিক বিপর্যয় আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে উদ্ধারকাজের পাশাপাশি উভয় দেশের সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রাখা হয়েছে।