সারাদেশে যখন জালানি তেল ও গ্যাসের সংকটে সাধারণ মানুষের চরম অবস্থা, ঠিক তখনই নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) যমুনা ও মেঘনা ডিপোকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী চোরাই তেল সাম্রাজ্য। দিনদুপুরে কিংবা রাতের আঁধারে প্রকাশ্যে চলছে এই ডিপো-কেন্দ্রিক তেলচুরি। আর অবৈধ এই কারবারের মাধ্যমে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছে ফতুল্লার পঞ্চবটী এলাকার চিহ্নিত রায়হান-সুমন-সুজন সিন্ডিকেট।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফতুল্লার ফাজিলপুরের তেল টোকাই অহিদের ছেলে রায়হান, ড্রাইভার মান্নানের ছেলে সুজন ও সুমন দীর্ঘদিন ধরে এই চোরাই তেল কারবারের মূল রূপকার। নিজেদের অবৈধ কর্মকাণ্ড ধামাচাপা দিতে তারা আর.জে.টি এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করছে। একসময় অভাব-অনটনে দিন কাটানো এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা এখন একেকজন বিপুল পরিমাণ জমিজমা, ৭-৮টি ট্যাংকলড়ি, একাধিক মোটরসাইকেল ও দামি বিলাসবহুল গাড়ি ও বাড়ির মালিক। এমনকি বর্তমানে তাদের নিজস্ব পার্টনারশিপে হাজার হাজার লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন বিশাল ট্যাংকলড়ি ও নামে-বেনামে বিঘার পর বিঘা প্লট রয়েছে। এলাকায় তাদের চোখধাঁধানো বিলাসবহুল জীবনযাপনে সাধারণ মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, যমুনা বা মেঘনা ডিপো থেকে ৯ হাজার লিটারের একটি ট্যাংকলড়ি পেট্রোল পাম্পের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার পর পথিমধ্যেই এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ডিপো থেকে পাম্পে পৌঁছানোর আগেই নির্জন স্থানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ধাপে ধাপে প্রায় ১ হাজার লিটার তেল চুরি করে নেওয়া হয়। ফলে একদিকে যেমন পাম্প মালিকরা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে এর মাশুল গুণতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের। ডিপো থেকে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই তেল চুরি হয়ে যাওয়ায় গ্রাহকরা প্রতি লিটারে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ মিলিলিটার পর্যন্ত তেল কম পাচ্ছেন।
ফতুল্লার বনানী সিনেমা হলের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে মাসোহারা দিয়ে হলের একটি দোকান ভাড়া নিয়ে কার্যালয় বানিয়েছে চক্রটি। অভিযোগ রয়েছে, নাইটগার্ডের যোগসাজশে মাঝরাতে হলের ভেতরেই বসে মাদকের আসর ও চালায় অনৈতিক কর্মকাণ্ড। পাশাপাশি আফাজউদ্দিনের ওয়ার্কশপের সামনে চোরাই তেল মজুদের জন্য গোপন গুদামঘর গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিদিন রাতে পিকআপ, মোটরসাইকেল ও ছোট ছোট বাহনে করে চোরাই তেলের চ্যালান আনা-নেওয়া করা হয়। প্রকাশ্য এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করা তো দূরের কথা, কেউ ছবি বা ভিডিও তোলার চেষ্টা করলে বেতনভুক্ত ক্যাডার রাজিবসহ সিন্ডিকেটের সন্ত্রাসীরা মোবাইল কেড়ে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন চালায়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, মাঝেমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে লোকদেখানো অভিযান চালানো হলেও মূল হোতারা রহস্যজনকভাবে অধরা থেকে যায়। অভিযানের পূর্বেই খবর পেয়ে চক্রের মূল পণ্ডারা সটকে পড়ে, যা অদৃশ্য কোনো ক্ষমতার সংকেত দেয়।
এছাড়া অননুমোদিত জায়গায় দাহ্য পদার্থ ও তেল লোড-আনলোডের কারণে যে কোনো সময় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকিতে রয়েছে পুরো পঞ্চবটী এলাকা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মূল অভিযুক্ত রায়হানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি তেলের ব্যবসার সাথে যুক্ত নই, আমার বাবার তেলের গাড়ি রয়েছে। আপনারা এসে দেখে যান।
তবে এলাকার শান্তিকামী জনগণ ও ব্যবসায়ীরা অবিলম্বে এই অবৈধ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধে যৌথ বাহিনীর চিরুনি অভিযান এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে রায়হানগংদের অবৈধ সম্পদের হিসাব অনুসন্ধানের জোরালো দাবি জানিয়েছেন।