একটি সরকার বিদায় নেওয়ার পর তার গৃহীত সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পুনর্বিবেচনার মুখে পড়া নতুন কিছু নয়। তবে সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা শীর্ষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যখন দুর্নীতি, নিয়োগ-বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিদেশে অর্থপাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তখন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে তৈরি হয় গভীর প্রশ্ন। সম্প্রতি সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ২ সেপ্টেম্বর দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এ অনুসন্ধানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
দুদকের এই পদক্ষেপে কেবল একজন সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগই সামনে আসেনি, বরং পুরো অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও জোরদার হয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই সময়কালের মধ্যে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে মোট ১১টি পৃথক অভিযোগ জমা পড়ে। এসবের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো যুব ও ক্রীড়া এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও বদলি- বাণিজ্য।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে লেনদেন: ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে বদলির বিনিময়ে ৭৬ লাখ টাকা এবং ১৫০ জন সহকারী কর্মকর্তার পদোন্নতি ও পদায়নের নামে সাড়ে ৩ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
প্রকল্প ও টেন্ডার কমিশন: স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার টেন্ডার নিষ্পত্তি থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায়ের দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ পেতে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দিতে হতো এবং এসব তদারকি করতেন তৎকালীন প্রেস সেক্রেটারি।
বিশাল অংকের নিয়োগ-বাণিজ্য: ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগের বিনিময়ে মানি এক্সচেঞ্জ ও নগদে ১০ কোটি টাকা এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগে ২০ কোটি টাকাসহ পরবর্তী বিভিন্ন প্রকল্পে কমিশনের চুক্তি ছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
ডিসি পদায়ন: সারাদেশে ৪৮ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগের সুপারিশ এবং এর বিনিময়ে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের দাবি তদন্তাধীন রয়েছে।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট সাবেক এই উপদেষ্টার দেশীয় ব্যাংক হিসাব ছাড়াও বিদেশে সম্পত্তি, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে অর্থ গচ্ছিত রাখার নানা অনিয়ম খতিয়ে দেখতে নথিপত্র ও আর্থিক লেনদেনের সত্যতা যাচাই করছে কমিশন।
দুর্নীতির এই অভিযোগ কেবল একটি মন্ত্রণালয়েই সীমাবদ্ধ নেই। অনুসন্ধানের আওতায় আসছে সাবেক অন্য উপদেষ্টাদের সময়কার বেশ কিছু আলোচিত সিদ্ধান্ত।
বিচার বিভাগ ও সাব-রেজিস্ট্রার বদলি: তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের মেয়াদে নিবন্ধন অধিদপ্তরের বিপুল সংখ্যক সাব-রেজিস্ট্রার এবং উচ্চ ও অধস্তন আদালতের শত শত বিচারক গণবদলির পেছনে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার করে জামিন-বাণিজ্য এবং ২৫২টি নতুন রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রদানে অনিয়মের দাবিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
সম্পদের অস্বভাবিক বৃদ্ধি ও মধ্যস্থতা: সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও তার পরিবারের অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধি এবং তার স্বামীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক লেনদেনে মধ্যস্থতার নানা তথ্য সাময়িক আলোচনায় এসেছে।
অন্যান্য প্রশাসনিক দায়িত্ব: এ ছাড়া সাবেক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, নুরজাহান বেগম ও আদিলুর রহমান খানের বিরুদ্ধেও সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে অভিযোগ কমিশনে জমা পড়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনকালের কিছু সিদ্ধান্ত ও আর্থিক লেনদেন নিয়েও অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে। ২০২৪ সালের শেষভাগ থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ফ্রান্স ও আমেরিকার গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তহবিলে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৭০ কোটি টাকা স্থানান্তরের বৈধতা ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একই সাথে গ্রামীণ ইউনিভার্সিটির অনুমোদন, ডিজিটাল ওয়ালেট লাইসেন্স ও গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারি শেয়ার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্তগুলো কোনো স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) তৈরি করেছিল কি না—তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যেকোনো অভিযোগই সরাসরি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। প্রশাসনিক ও আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মুখরোচক অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকেই দোষী সাব্যস্ত করা যেমন অনুচিত, তেমনি নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া কাউকে দায়মুক্তি দেওয়াও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির পরিপন্থী।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত সুবিধা নেওয়া হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ, তথ্যভিত্তিক ও সুনির্দিষ্ট দলিলনির্ভর তদন্ত। ব্যাংকিং চ্যানেল, টেন্ডার ফাইল, পদায়নের নথি এবং এনবিআরের আয়কর রেকর্ড বিশ্লেষণের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন করাই এখন দুদকের মূল চ্যালেঞ্জ।