নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার লামাপাড়া-শিবু মার্কেট এলাকায় বাবুল-হেনা-রনিকে ঘিরে ওঠা নানা অভিযোগ নিয়ে আবারও আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। মসজিদ, পঞ্চায়েত ও কবরস্থান কমিটির অর্থ ব্যবস্থাপনা, জমি-সম্পত্তি নিয়ে প্রভাব বিস্তার এবং মাদক কারবারের অভিযোগ নিয়ে ইতোমধ্যে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও অভিযুক্তরা এখনও এলাকায় সক্রিয় থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। অভিযোগের পরও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, লামাপাড়ার ঐতিহ্যবাহী দরগাহ বাড়ি জামে মসজিদ, পঞ্চায়েত ও কবরস্থানকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ মুসল্লিরা। বিশেষ করে দীর্ঘ সময়ের আর্থিক হিসাব প্রকাশের দাবি ওঠার পর থেকেই বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
স্থানীয় সূত্র ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাবুল মিয়া ও হেনা মিয়াকে ঘিরে এলাকায় দীর্ঘদিনের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় আর্থিক সংকটে থাকা বাবুল মিয়া মাটি কেটে বিভিন্ন ইটভাটায় সরবরাহের কাজ করতেন। অন্যদিকে হেনা মিয়া জমি-জমা সংক্রান্ত দালালি করতেন বলে জানান তারা। পরবর্তীতে দুই পরিবারের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি হলে এলাকায় তাদের প্রভাবও বাড়তে থাকে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এলাকাবাসীর দাবি, লামাপাড়ায় নতুন কেউ জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করলে বিভিন্নভাবে তাকে চাপে রাখার ঘটনা ঘটেছে। রাস্তা ব্যবহার, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা নিয়ে জটিলতা তৈরির অভিযোগও রয়েছে। পরিস্থিতির কারণে কয়েকজন বাড়ির মালিক কম দামে সম্পত্তি বিক্রি করে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলেও স্থানীয়দের দাবি।
এদিকে বাবুলের ছেলে রনিকে ঘিরে মাদক কারবারের অভিযোগও নতুন করে সামনে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রনির বাসায় সোহেল নামে এক ভাড়াটিয়াকে আশ্রয় দিয়ে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। রনির ভাই আবদুল্লাহকেও মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তাদের দাবি, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করা হলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
অন্যদিকে ‘দরগাহ বাড়ি জামে মসজিদ’ পঞ্চায়েত ও বাজারকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। স্থানীয় মুসল্লিদের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় হলেও তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। মসজিদ পরিচালনার বিভিন্ন খাতে ব্যয়, সম্মানী এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অর্থ বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে জানান তারা।
স্থানীয়দের দাবি, সাধারণ মুসল্লিরা প্রায় ৩০ বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব চাইলে মসজিদ পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তিকে নিয়ে রহস্য তৈরি হয়। তাকে আত্মগোপনে পাঠিয়ে পরে থানায় নিখোঁজ সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি করার অভিযোগও রয়েছে। পরবর্তীতে ওই ব্যক্তির সন্ধান পাওয়ার পর তার ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৫০ লাখ টাকা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে স্থানীয়দের দাবি। তবে ওই অর্থের উৎস কী এবং মসজিদ বা পঞ্চায়েতের অর্থের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, একসময় আর্থিকভাবে স্বচ্ছল না থাকা বাবুল ও হেনার পরিবারের নামে বর্তমানে একাধিক বহুতল ভবন ও বিপুল সম্পদ রয়েছে। অল্প সময়ে এই সম্পদের বিস্তার কীভাবে ঘটেছে, এর বৈধ উৎস কী তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। মসজিদের জমি বিক্রি, দান-ছদকার অর্থ কিংবা পঞ্চায়েতের তহবিলের সঙ্গে এসব সম্পদের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
স্থানীয় মুসল্লি ও বাসিন্দাদের বক্তব্য, অভিযোগগুলো সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও পরিষ্কার হওয়া দরকার। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ঝুলে থাকলে একদিকে যেমন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে জনমনে সন্দেহ বাড়ে, অন্যদিকে প্রশাসনের ওপরও আস্থার সংকট তৈরি হয়।
এলাকাবাসী মসজিদ, পঞ্চায়েত ও কবরস্থানসহ সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক কর্মকাণ্ড নিরপেক্ষভাবে যাচাই, দীর্ঘদিনের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা এবং মাদক কারবারের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এখন স্থানীয়দের অপেক্ষা- অভিযোগের পর অভিযোগের এই দীর্ঘ তালিকার শেষ কোথায়? তদন্ত হবে, নাকি প্রশ্নগুলোই থেকে যাবে অমীমাংসিত? এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব নয়, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই নেওয়া হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
