মানুষের বিপদে ছুটে যাওয়া, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো আর মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেওয়াই ছিল সুমাইয়ার পথচলার অংশ। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্ন সময় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই মানবিক মানুষটিই আজ নিজেই অসুস্থতা, স্বামী হারানোর বেদনা ও চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
বরগুনার আমতলী উপজেলার ৫নং চাওড়া ইউনিয়নের চন্দ্র চৌধুরী পাড়া গ্রামের বাসিন্দা সুমাইয়া দীর্ঘদিন ধরে মরণব্যাধি রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন। তার বাবা স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিছানায় পড়ে আছেন। বৃদ্ধ মাও অসহায়। নিজের চিকিৎসা, বাবার চিকিৎসা এবং পরিবারের নিত্যদিনের খরচ—সব মিলিয়ে চরম আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটছে তাদের।
এরই মধ্যে সুমাইয়ার জীবনে নেমে আসে আরও এক নির্মম আঘাত। রমজানের শেষের দিকে এক প্রবাসী যুবকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। কিন্তু স্বামী প্রবাসে থাকায় বিয়ের পরও তার সঙ্গে সরাসরি দেখা করার সুযোগ হয়নি সুমাইয়ার। ফোনে কথাবার্তার মধ্য দিয়েই চলছিল তাদের দাম্পত্য জীবনের শুরু। এরই মধ্যে সুমাইয়ার শরীরে ধরা পড়ে মরণব্যাধি রোগ। তার অসুস্থতার খবর জানার পর অসুস্থতার অজুহাতে কিছুদিন আগে স্বামী তাকে ডিভোর্স দিয়ে দেন। ফলে স্বামীকে কাছে পাওয়ার আগেই দাম্পত্য জীবনের ইতি ঘটে সুমাইয়ার।
একদিকে নিজের অসুস্থতা ও চিকিৎসার ব্যয়, অন্যদিকে স্বামী হারানোর কষ্ট, অসুস্থ বাবার দায়িত্ব এবং সংসারের অভাব-অনটন—সবকিছু মিলিয়ে কঠিন সময় পার করছেন সুমাইয়া। চিকিৎসার খরচ ও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছেন তিনি।
এমন দুঃসময়ে সুমাইয়াকে একা থাকতে দেয়নি তার সহযোদ্ধারা। শনিবার (১৫ আগস্ট) তার অসুস্থতার খবর পেয়ে ‘স্বপ্নছোঁয়া’ স্বেচ্ছাসেবী যুব সংগঠনের সদস্যরা সুমাইয়ার বাড়িতে গিয়ে তার পাশে দাঁড়ান। এ সময় সংগঠনের পক্ষ থেকে তার হাতে নগদ অর্থ সহায়তা তুলে দেওয়া হয়।
সংগঠনের সদস্যরা বলেন, সুমাইয়া শুধু সংগঠনের একজন সদস্য নন, তিনি একজন মানবিক সহযোদ্ধাও। মানুষের প্রয়োজনে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্ন সময় তিনি পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাই আজ তার নিজের জীবনে সংকট নেমে এলে তাকে একা ফেলে রাখা সম্ভব নয়।
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি মোঃ রিয়াজুল ইসলামের উদ্যোগে এ মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তিনি বলেন, “সুমাইয়া একসময় মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়িয়েছেন। আজ তার প্রয়োজনের সময়ে স্বপ্নছোঁয়া তার পাশে দাঁড়িয়েছে। মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য।”
সহায়তা প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের উপদেষ্টা তানজিল শিকদার, সহ-সভাপতি সজিব, সাংগঠনিক সম্পাদক রাহাতসহ সংগঠনের অন্যান্য সদস্যরা।
এ সময় সংগঠনের উপদেষ্টা তানজিল শিকদার সুমাইয়া ও তার পরিবারের পাশে নিয়মিতভাবে থাকার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি তিনি প্রতি মাসে ব্যক্তিগতভাবে পরিবারটিকে আর্থিক সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দেন। তার এমন উদ্যোগে সুমাইয়া ও তার পরিবার কিছুটা হলেও স্বস্তি ও সাহস পেয়েছেন।
সহায়তা পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সুমাইয়া। নিজের অসুস্থতা, স্বামী হারানোর কষ্ট, বাবার অসহায়ত্ব ও পরিবারের আর্থিক সংকটের মধ্যে সহযোদ্ধাদের এমন সহযোগিতা তার কাছে হয়ে ওঠে আশার আলো। দুঃসময়ে পরিচিত মানুষ ও সহযোদ্ধাদের পাশে পাওয়া তাকে নতুন করে লড়াই করার সাহস জুগিয়েছে।
স্থানীয়রা ‘স্বপ্নছোঁয়া’র এমন উদ্যোগকে প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, একটি সামাজিক সংগঠনের সার্থকতা শুধু আর্থিক সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বিপদের সময়ে একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে মানসিক শক্তি ও সাহস দেওয়াও বড় মানবিক দায়িত্ব।
যে সুমাইয়া একদিন অন্যের বিপদে নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, আজ তার দুঃসময়ে সেই হাতের পাশেই দাঁড়িয়েছে সহযোদ্ধাদের হাত। রোগ, স্বামী হারানোর বেদনা, অসুস্থ বাবার দায়িত্ব ও আর্থিক সংকটের কঠিন সময়ে ‘স্বপ্নছোঁয়া’র এই সহযোগিতা তার জীবনে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং নতুন করে লড়াই করার সাহস ও আশার বার্তাও হয়ে এসেছে।
মানবিকতার এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ‘স্বপ্নছোঁয়া’ আবারও প্রমাণ করেছে—মানুষের জন্য করা ভালো কাজ কখনো হারিয়ে যায় না। প্রয়োজনের সময়ে সেই মানবিকতাই ফিরে আসে সহমর্মিতা, সাহস ও সহযোগিতার হাত হয়ে।