বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:০১ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম
সংবাদ শিরোনাম
আমতলীতে স্বপ্নছোঁয়ার উদ্যোগে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ও বৃক্ষরোপণ ফতুল্লায় ১০পাতা হেরোইনসহ মোহন গ্রেপ্তার ফতুল্লায় এএসআই হামিদ খানকে বহালের দাবিতে ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ আবেদন ফতুল্লায় বৈষম্যবিরোধী মামলার আসামি তাঁতী লীগ নেতা ইপু গ্রেপ্তার বকশীগঞ্জে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মরণসভায় উত্তেজনা: তোলারাম কলেজে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সংঘর্ষ, আহত অন্তত ৮-১০ ফতুল্লায় থানার ভেতরে ‘সমঝোতা’ নাকি ‘সালিশ’? প্রশ্নের মুখে পুলিশ কর্মকর্তা আমতলীতে সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্স পিএলসি’র মাসিক ব্যবসায়ীক উন্নয়ন সভা অনুষ্ঠিত পানিবন্দী শতাধিক পরিবারের পাশে দাঁড়ালেন মেয়র প্রার্থী হাজ্বী রাসেল মাহমুদ ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট উপলক্ষে কলমাকান্দায় বিএনপির বিজয় র‍্যালি

ধূমপান রোধে তামাক কর নীতি ব্যর্থ: সস্তা ব্র্যান্ড ও ভেপিংয়ে ঝুঁকছে তরুণরা, কাটছাঁট হচ্ছে খাদ্যের বাজেট

মো. সোহেল আহমেদ / ১৫৯ বার পঠিত
প্রকাশিত সময় : মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০৫:০৯ অপরাহ্ন

তামাকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে প্রতি বছর কর বৃদ্ধির মাধ্যমে দাম বাড়ানো হলেও তরুণদের ধূমপানের অভ্যাসে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে না। বরং করের বোঝা এড়াতে তরুণ ধূমপায়ীরা বেছে নিচ্ছে কম দামি সস্তা ব্র্যান্ড কিংবা ই-সিগারেট (ভেপ)। এমনকি এই মরণনেশার খরচ জোগাতে গিয়ে তারা খাদ্য, যাতায়াত ও পড়াশোনার মতো মৌলিক ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতের বাজেট কাটছাঁট করছে।

‘ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট’ (ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট) পরিচালিত ২০২৬ সালের এক সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে দেশের তরুণ ধূমপায়ীদের এই বিপজ্জনক ও উদ্বেগজনক আচরণের চিত্র উঠে এসেছে। দেশের ৮টি বিভাগের ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৩৯১ জন তরুণের ওপর এই জরিপ চালানো হয়।

কর বাড়লেও অপরিবর্তিত ৭৯% তরুণের ধূমপান

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মূল্যবৃদ্ধির পরও প্রায় ৭৯ দশমিক ২৮ শতাংশ তরুণ ধূমপায়ীর আচরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এর মধ্যে ৭৬ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ তরুণের ধূমপানের পরিমাণ আগের মতোই রয়েছে এবং ৩ দশমিক ২ শতাংশের ক্ষেত্রে এই হার উল্টো বৃদ্ধি পেয়েছে। মাত্র ২০ দশমিক ৭২ শতাংশ তরুণ দাম বাড়ার কারণে ধূমপানের পরিমাণ কমিয়েছেন।

ধূমপানের অভ্যাস ধরে রাখতে তরুণদের বড় অংশই মূলত ব্র্যান্ড পরিবর্তন করছে। দাম বাড়ার পর ২১ দশমিক ২৩ শতাংশ তরুণ সরাসরি কম দামি ব্র্যান্ডে চলে গেছে এবং ৫৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ তরুণ নিয়মিত বা মাঝে-মধ্যে সস্তা ব্র্যান্ডের সিগারেট খাচ্ছেন।

যেমন রাজধানীর সতীন্দ্রনাথ (৪০) নামের এক চেইন স্মোকার জানান, দাম বাড়ার কারণে ২০২২ সাল থেকে তিনি প্রথমে বেনসন ছেড়ে গোল্ডলিফ এবং পরবর্তীতে গোল্ডলিফ ছেড়ে এখন ওরিস সিগারেট খাওয়া শুরু করেছেন। আবার রফিক মৃধা নামের এক বেসরকারি চাকরিজীবীর মতে, প্রতি বছর সামান্য করে দাম না বাড়িয়ে ধূমপান ঠেকাতে এক লাফে বেশি পরিমাণ দাম বাড়ানো উচিত।

মৌলিক চাহিদা ও খাদ্যের বাজেট কাটছাঁট

নেশার টাকা জোগাতে তরুণদের খরচের খাত পরিবর্তনের চিত্রটি রীতিমতো ভয়াবহ। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ তরুণ সিগারেটের টাকা মেটাতে তাদের প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়েছেন। এই অংশের মধ্যে ৭৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ তরুণ মূলত তাদের খাবার, যাতায়াত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতের বাজেট কমিয়েছেন। এছাড়া ২৩ শতাংশ পারিবারিক বাজেট থেকে এবং ১ দশমিক ২৪ শতাংশ তরুণ পড়াশোনা বা বিনোদনের টাকা বাঁচিয়ে সিগারেটের পেছনে ব্যয় করছেন, যা তাদের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

নতুন মহামারি: ই-সিগারেট ও ভেপিং

তরুণদের মধ্যে ই-সিগারেট বা ভেপিংয়ের জনপ্রিয়তা এখন নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালের সরকারি তথ্য (জিএটিএস) অনুযায়ী দেশে ভেপ ব্যবহারকারী ছিল মাত্র ০.২ শতাংশ। কিন্তু ২০২৬ সালের এই গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী তরুণদের মধ্যে ই-সিগারেট ব্যবহারের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ৭ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। তামাক কোম্পানিগুলোর সুগন্ধিযুক্ত উপাদানের আকর্ষণ ও চতুর বিপণনের কারণেই তরুণরা এই মরণনেশায় আকৃষ্ট হচ্ছে। এছাড়া ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ তরুণ সিগারেটের পাশাপাশি জর্দা ও গুলের মতো ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করছে।

রাজস্ব ফাঁকি ও আইনের দুর্বলতা

বাজারে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) অমান্য করার এক নতুন প্রবণতা দেখা গেছে। ৭২ দশমিক ৩৮ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন, তারা নির্ধারিত এমআরপির চেয়ে বেশি দামে খুচরা সিগারেট কিনছেন। অন্যদিকে, ২৬ শতাংশ তরুণ এমআরপি কত তা জানেনই না। সরকারের জটিল কর কাঠামো এবং খুচরা শলাকা বিক্রির সুযোগ নিয়ে তামাক কোম্পানিগুলো প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে।

সচেতনতাই প্রধান চালিকাশক্তি

যে সামান্য অংশ (২০.৭২%) ধূমপান কমিয়েছে, তাদের প্রধান কারণ কোনো অর্থনৈতিক চাপ নয়, বরং স্বাস্থ্য সচেতনতা। ৪১ দশমিক ৯৯ শতাংশ তরুণ স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা চিন্তা করে ধূমপান কমিয়েছেন। এছাড়া আসক্তির অভাবের কারণে ১৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ, আর্থিক চাপের কারণে ১৪ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং পাবলিক প্লেসে কড়াকড়ির কারণে ২৩ দশমিক ৮১ শতাংশ তরুণ ধূমপান কমিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও সুপারিশ

ড. রুমানা হক (অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়):

“সিগারেটের মতো তীব্র আসক্তি তৈরি করা দ্রব্যের ক্ষেত্রে দাম ১০ শতাংশ বাড়লে চাহিদা ১০ শতাংশ কমে না, বরং কমে মাত্র ৬ শতাংশ। তবে করের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে যদি দাম তরুণদের ক্রয়ক্ষমতার একদম বাইরে নিয়ে যাওয়া যায়, তবে তারা শুরুতেই এই নেশার প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলবে।”

ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ (ইমেরিটাস অধ্যাপক ও প্রখ্যাত চিকিৎসক):

“শুধু কর বাড়িয়ে এই আসক্তি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এজন্য উন্মুক্ত স্থান, পার্ক, রেস্টুরেন্ট ও গণপরিবহনে ধূমপান বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। সরকার চাইলে এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার মতো সিদ্ধান্তও নিতে পারে।”

সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন (মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী):

“তামাক মানুষের শরীরের এমন কোনো অঙ্গ নেই যা আক্রান্ত করে না। প্রচলিত আইনের ফাঁক গলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। তামাকের থাবা থেকে সমাজকে রক্ষা করতে আইন আরও কঠোর ও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।”

তামাক নিয়ন্ত্রণে মূল সুপারিশমালা:

১. স্তরভিত্তিক কর কাঠামো বাতিল করে সহজ সুনির্দিষ্ট কর ব্যবস্থা চালু করা।

২. খুচরা শলাকা (সিঙ্গেল স্টিক) সিগারেট বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।

৩. অতি দ্রুত আইন পাস করে বাংলাদেশে ই-সিগারেট বা ভেপিং পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা।

৪. বাজারে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) কঠোরভাবে মনিটরিং করা।

৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়ানো এবং ধূমপান ত্যাগ সহায়তা কেন্দ্র চালু করা।


এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..
এক ক্লিকে বিভাগের খবর