নেত্রকোনার বারহাট্টায় কলেজছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী মো. আজিজুল হক (২০) হত্যা মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নিহতের পরিবারকে হুমকি ও চাপ প্রয়োগের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় নিহতের চাচা ও মামলার অন্যতম প্রধান সাক্ষী করিমুল হককে (৫৮) প্রকাশ্য দিবালোকে অপহরণ করে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জামিনে মুক্ত থাকা আসামিরা এই বর্বরোচিত ঘটনা ঘটিয়েছে। এ ঘটনার পর থেকে সন্তানহারা এক বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
মামলার বিবরণ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় আবু আব্বাছ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী মো. আজিজুল হককে। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে রকি, রবিন ও ইনচান মিয়াসহ তাদের বাহিনী এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। ঘটনার পর নেত্রকোনা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ইউনিট খুনিদের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন করেছিল। পরবর্তীতে আসামিরা গ্রেপ্তার হলেও জামিনে মুক্তি পান।
ভুক্তভোগীর পরিবারের দাবি, জামিন পাওয়ার পর থেকেই রবিন-রকি সন্ত্রাসী বাহিনী মামলা তুলে নেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে নিহত আজিজুলের চাচা ও মামলার প্রধান সাক্ষী করিমুল হক বারহাট্টা সদরে গেলে আসামিরা তার পথরোধ করে অপহরণ করে।
পরে বারহাট্টার বু-কালিকা পুরাতন কোর্টের ভেতরে একটি জরাজীর্ণ পরিত্যক্ত ঘরে আটকে রেখে তার হাত-পা লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। সেখানে লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে তার শরীরে নির্মম নির্যাতন চালানো হয় এবং তার কাছ থেকে একটি মোবাইল ও নগদ ২০,৭০০ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির খবরের ভিত্তিতে বারহাট্টা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে করিমুল হককে রক্তাক্ত ও মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে বারহাট্টা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। এ ঘটনায় করিমুল হক বাদী হয়ে বারহাট্টা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, আসামিরা জামিনে বের হয়ে এলাকায় পুনরায় জুয়া ও মাদকসহ বিভিন্ন অসামাজিক কার্যক্রম চালাচ্ছেন। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, নির্যাতনের ঘটনার পর থানায় আনার পরও মূল অভিযুক্ত রবিন লকআপের ভেতর থেকে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে মামলা তুলে না নিলে সবাইকে খুন করার হুমকি দেয়। আসামিদের এমন বেপরোয়া রূপের কারণে নিহতের পরিবার বর্তমানে ফেরারি জীবন কাটাচ্ছে।
সন্তানহারা বীর মুক্তিযোদ্ধা পিতা মো. মঞ্জুরুল হক অশ্রুসজল চোখে বলেন, দেশ স্বাধীন করতে আমরা যুদ্ধ করেছি, আর আজ স্বাধীন দেশে সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে আমার সন্তানকে রক্ত দিতে হলো! আমার স্ত্রী সন্তানের শোকে বিগত ১০ বছর যাবত পাগলের মতো বিছানায় পড়ে আছে। বিচারের আশায় ১০ বছর ধরে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি, কিন্তু আজ আমরাই আসামিদের ভয়ে ফেরারি। আমরা প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে অবিলম্বে এই সন্ত্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক জড়িতদের কঠোর শাস্তি ও ফাঁসি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন নিহত আজিজুলের পরিবার ও আসমা ইউনিয়নের সর্বস্তরের এলাকাবাসী।