একসময়ে ফতুল্লার কুতুবপুর ইউনিয়নে রাজনীতিতে বিএনপির প্রভাবশালী নেতা মনিরুল আলম সেন্টুর রাজনৈতিক কৌশল এবং তার দীর্ঘদিনের অনুসারী ফতুল্লা থানা বিএনপির বর্তমান সভাপতি শহিদুল ইসলাম টিটুর মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা। শিক্ষক-শিষ্য বা ওস্তাদ-শাগরেদ ‘ হিসেবে পরিচিত এই দুই নেতার রাজনৈতিক পথচলা এবং সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্য দূরত্ব স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে।
কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদে বারবার বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে মনিরুল আলম সেন্টু নিজের শক্ত জনভিত্তি তৈরি করেছিলেন। মূলত কুতুবপুরে নিজের একক আধিপত্য ও প্রভাব বজায় রাখতে দল পরিবর্তনকে হাতিয়ার করেছিলেন তিনি-তা বিএনপি হোক কিংবা আওয়ামী লীগ।
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ধানের শীষের পরিবর্তে স্বতন্ত্র প্রার্থী (আনারস প্রতীক) হিসেবে নির্বাচন করে আওয়ামী লীগের সমর্থনে কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ফতুল্লা থানা বিএনপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সেন্টুর পরিচিতি পাল্টাতে থাকে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগে পরবর্তীতে বিএনপি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। পরবর্তীতে তিনি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমানের সাথে রাজনৈতিক সখ্যতা গড়ে তোলেন এবং আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করে জয়লাভ করেন। এরপর বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তাকে প্রকাশ্যেই জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দেখা যায়।
তবে রাজনৈতিক নানা পটপরিবর্তন ঘটলেও মনিরুল আলম সেন্টু তার রাজনৈতিক শিষ্য শহিদুল ইসলাম টিটুর সাথে যোগাযোগ অক্ষুণ্ন রাখেননি। বিগত আওয়ামী লীগ আমলেও কুতুবপুরে টিটুর বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও মিছিল পরিচালিত হয়েছে, যার নেপথ্যে আর্থিক জোগান ও মূল পৃষ্ঠপোষকতা ছিল সেন্টুরই।
সেন্টুর সুদূরপ্রসারী চিন্তা ছিল—ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় না ফিরলেও তার শিষ্য টিটু ফতুল্লায় বিএনপির হাল ধরে রাখবেন এবং ওস্তাদের অনুগত থাকবেন। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দৃশ্যপট পাল্টে গেছে।
সম্প্রতি ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শহিদুল ইসলাম টিটু এক বক্তব্যে নাম উল্লেখ না করে কুতুবপুরের এই হাইব্রিড রাজনীতি ও সাবেক রাজনৈতিক গুরু সেন্টুর ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন।
দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন,প্রিয় সাথী ও বন্ধুরা আমার, ইতিমধ্যে দেখতে পারছি কিছু হাইব্রিড আমাদের দলে ঢুকেছে বিভিন্ন কারণে। আপনারা সবাই অবগত আছেন কেন, কি কারণে, কখন তাদেরকে ঢুকানো হয়েছে? আজকে তারা গ্রুপিং সৃষ্টি করতে চাচ্ছেন। আমি এই মঞ্চ থেকে বলতে চাই, এই ত্যাগী নেতাদেরকে বিভ্রান্ত করবেন না। বিগত সতেরো বছর অনেক কষ্ট করেছেন এই ত্যাগী নেতাকর্মীরা। আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন, নিজের রক্ত ঝরিয়েছেন, বছরের পর বছর জেল খেটেছেন। আজকে যদি আপনারা মনে করেন, ১৭ বছর একটি দলের ছায়ায় থেকে, আজকে এসে আবার বিএনপির নেতৃত্ব দিবেন, এটা ভুল ধারণা, হারিয়ে যাবেন। হারিয়ে যাবেন! বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীদের পায়ের পিষ্টে পড়ে হারিয়ে যাবেন।
তিনি আরও যোগ করেন, নেতাকর্মীদের কোনোভাবেই বিভ্রান্ত না করে তারেক রহমানের হাতকে শক্তিশালী করতে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গঠনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে মনিরুল আলম সেন্টুর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হয়েছে। তবে ফতুল্লা থানা বিএনপির রাজনীতিতে এক টেবিলে বসতে নারাজ ফতুল্লা থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনিরুল আলম সেন্টু। যে খানে একসময় রাজনীতির মাঠে সেন্টুর সভা সামাবেশে প্রধান অতিথির আসনে থাকতেন সেন্টু তার আদেশ নির্দেশ পালন টিটু আর এখন প্রটোকল অনুযায়ী সেই আসনে থাকবেন তার শীষ্য টিটু, এমন কি কুতুবপুরের সেন্টু আধিপত্য ও প্রভাব নিয়ন্ত্রে মরিয়া টিটু।
কুতুবপুরে তার একক আধিপত্য ও প্রভাব বজায় রাখতে একসময়ের ওস্তাদ-শাগরেদ এর সম্পর্কের এই ভাঙন কুতুবপুরের আগামী দিনের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত।
চলবে….