ঐতিহ্যবাহী ঢাকা–নারায়ণগঞ্জ পুরাতন পাগলা সড়ক একসময় এ অঞ্চলের শিল্প, বাণিজ্য ও যোগাযোগের অন্যতম প্রধান অবলম্বন ছিল। ব্রিটিশ আমলে ১৮৮৭ সালে নির্মিত এই সড়কটি বর্তমানে ব্যাপক দখলদারিত্বের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। সরকারি নথিতে ১৫০ ফুট প্রশস্ততার উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে কোথাও কোথাও সড়কটি মাত্র ২৪ ফুটে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিদিন দীর্ঘ যানজট, দুর্ভোগ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছেন হাজারো পথচারী ও যানবাহন চালক।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, চাষাঢ়া থেকে পোস্তগোলা সেতু পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কের দুই পাশের বিপুল পরিমাণ সরকারি জমি বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দখলে রয়েছে। কোথাও স্থায়ী দোকানপাট, কোথাও বহুতল স্থাপনা, আবার কোথাও শিল্পকারখানার ডাম্পিং ইয়ার্ড গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে সড়কের জন্য অধিগ্রহণ করা বিশাল জায়গার অধিকাংশই এখন আর জনসাধারণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক স্থানে সড়কের প্রস্থ ৫০ ফুটেরও কম। দুই পাশের প্রায় ১০০ ফুট জায়গা দখল হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল হওয়ায় প্রতিদিন ভারী যানবাহনের চাপ বাড়ছে, কিন্তু সংকুচিত সড়কের কারণে যানজট এখন নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯ হাজার শতাংশ সরকারি জমি বর্তমানে বেদখলে রয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জমির বাজারমূল্য প্রতি শতাংশ প্রায় ৫০ লাখ টাকা হিসেবে মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। অথচ কোনো ধরনের বৈধ লিজ বা সরকারি অনুমোদন ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে এসব জায়গা ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি জমি দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ না থাকায় দখলদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার বলয়ে অনেকেই সরকারি জায়গা নিজেদের সম্পত্তির মতো ব্যবহার করছেন। কোথাও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সীমানা প্রাচীর সরকারি জমি পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়েছে, আবার কোথাও রাস্তার অংশ দখল করে রাখা হয়েছে নির্মাণসামগ্রী ও শিল্পপণ্যের স্তূপ।
এই সড়কে নিয়মিত চলাচলকারী আকবর হোসেন বলেন, রাস্তা যথেষ্ট প্রশস্ত হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালামাল ও অবৈধ দখলের কারণে দুটি বড় যানবাহন পাশাপাশি চলতে পারে না। ফলে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হয়।
অভিযোগের বিষয়ে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, সড়কের পাশে ফাঁকা জায়গা থাকায় সেটি অস্থায়ীভাবে ডাম্পিং স্পট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকার উন্নয়নকাজ শুরু করলে তারা জায়গা ছেড়ে দেবেন। তবে বাস্তবে মুন্সীখোলা ও শ্যামপুর এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, শিল্পকারখানার মালামাল সড়কের অনেকাংশ দখল করে রাখায় যান চলাচল আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এছাড়া পোস্তগোলা থেকে নারায়ণগঞ্জমুখী লেনের বড় অংশ ট্রাক পার্কিং ও শিল্পকারখানার ডাম্পিং স্পট হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বলেন, সড়কের দুই পাশের জেলা পরিষদের জমিতে যারা অবৈধভাবে দোকানপাট বা স্থাপনা নির্মাণ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি বৈধ লিজের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির পরিকল্পনাও রয়েছে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম জানান, পুরাতন পাগলা সড়কটি তাদের অধীনে নয়; এটি ঢাকা সড়ক বিভাগের আওতাভুক্ত হওয়ায় তারা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না।
অন্যদিকে ঢাকা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রিতেশ বলেন, ঢাকা–নারায়ণগঞ্জ পুরাতন পাগলা সড়ককে ঘিরে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা রয়েছে। এটি একটি বড় প্রকল্প হওয়ায় বাস্তবায়নে সময় লাগবে এবং বর্তমানে বিষয়টি পরিকল্পনা ও যাচাই-বাছাই পর্যায়ে রয়েছে।
দীর্ঘদিনের অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত ব্যবহার এবং সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে শতবর্ষী এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি আজ কার্যত সংকুচিত হয়ে পড়েছে। দ্রুত অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও পরিকল্পিত উন্নয়ন না হলে ভবিষ্যতে এই গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।