শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ নারায়ণগঞ্জ এখন চাঁদাবাজ ও আলোচিত সন্ত্রাসীদের তালিকায়ও শীর্ষে। পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) ১৫টি ব্যাটালিয়নের প্রস্তুত করা তালিকায় চাঁদাবাজ হিসেবে সবচেয়ে বেশি ৫৬৫ জনের নাম রয়েছে নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে। একই তালিকায় আলোচিত সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত ৪০৮ জনের নামও এই অঞ্চলের। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তুলনায় এই সংখ্যা সর্বোচ্চ।
এসআরবির গত ১০ সেপ্টেম্বর প্রস্তুত করা ‘ব্যাটালিয়ন অনুযায়ী আলোচিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং ছিনতাইকারীর সামারি’ শীর্ষক নথিতে উঠে এসেছে অপরাধপ্রবণতার এই চিত্র। তালিকার তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে চিহ্নিত ৩ হাজার ৫৮৬ জন চাঁদাবাজের মধ্যে প্রায় প্রতি ছয়জনের একজন নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের তালিকাভুক্ত। অন্যদিকে ২ হাজার ২৫৮ জন আলোচিত সন্ত্রাসীর তালিকাতেও শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে এই অঞ্চল।
চাঁদাবাজের সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চল। সেখানে এসআরবি-৭ ব্যাটালিয়নের তালিকায় নাম রয়েছে ৫০৩ জনের। নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম—এই দুই অঞ্চলের তালিকায় মোট ১ হাজার ৬৮ জন চাঁদাবাজের নাম রয়েছে, যা দেশজুড়ে তালিকাভুক্ত মোট চাঁদাবাজের প্রায় ৩০ শতাংশ। তবে তালিকায় নাম থাকা মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়; অভিযোগ ও তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
এসআরবি-১১ ব্যাটালিয়নের আওতাধীন এলাকায় রয়েছে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নির্দিষ্ট অংশ, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী। এসব অঞ্চলে শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, পরিবহন ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে চাঁদাবাজি প্রতিরোধ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে তালিকার ৫৬৫ জনের সবাই নারায়ণগঞ্জ জেলার বাসিন্দা কি না, সে বিষয়ে নথির উদ্ধৃত তথ্যে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে আসে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং শিল্পাঞ্চলের উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের ব্যাপ্তি ও প্রকৃত চিত্র নির্ধারণে নির্দিষ্ট ঘটনা, মামলা, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যের সমন্বিত যাচাই প্রয়োজন।
এসআরবির তালিকায় নারায়ণগঞ্জের শীর্ষ অবস্থান নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—শিল্প ও বাণিজ্যনির্ভর এই অঞ্চলে চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত এবং তা প্রতিরোধে বিদ্যমান নজরদারি কতটা কার্যকর। তালিকায় বিপুলসংখ্যক ব্যক্তির নাম থাকার বিষয়টি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা তথ্যের যথাযথ ব্যবহার, অভিযোগ যাচাই এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি পদক্ষেপের গুরুত্ব সামনে এনেছে।
এসআরবির নথিতে আলোচিত সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত ২ হাজার ২৫৮ জনের মধ্যে ৪০৮ জনের নাম রয়েছে নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে। দ্বিতীয় অবস্থানে সিরাজগঞ্জের এসআরবি-১২ ব্যাটালিয়ন, যেখানে তালিকাভুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৩২৪। চট্টগ্রামে ২৭৭ এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলে ২৩৯ জনের নাম রয়েছে। এ ছাড়া রাজশাহীতে ২১৬, খুলনায় ২১৪, সিলেটে ১৯৫ এবং কেরানীগঞ্জ অঞ্চলে ১০০ জনের নাম রয়েছে।
নথিতে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী নেতারাও রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের কারও কারও বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে একাধিক মামলার তথ্য রয়েছে। তবে রাজনৈতিক পরিচয়কে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, মামলার বর্তমান অবস্থা এবং আদালতের সিদ্ধান্ত আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।
চাঁদাবাজ ও আলোচিত সন্ত্রাসীর তালিকায় নারায়ণগঞ্জ এগিয়ে থাকলেও ছিনতাইকারীর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা। দেশজুড়ে চিহ্নিত ৫৩৪ জন ছিনতাইকারীর মধ্যে ১৩০ জনের নাম রয়েছে মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকার দায়িত্বে থাকা এসআরবি-২ ব্যাটালিয়নের তালিকায়।
এ ছাড়া মিরপুর অঞ্চলে ১১২, কেরানীগঞ্জ ও পুরান ঢাকায় ১০৩, শাহজাহানপুর ও পল্টন অঞ্চলে ৯৯ এবং উত্তরা অঞ্চলে ৯০ জনের নাম রয়েছে। নথির তথ্য অনুযায়ী, ছিনতাইকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিরা রাজধানী ও আশপাশের পাঁচটি ব্যাটালিয়নের আওতাভুক্ত। বাকি ১০টি ব্যাটালিয়নের তালিকায় এ ধরনের কোনো নাম নেই।
এসআরবির মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব পলাশ জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্যের ভিত্তিতে তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তালিকাটি নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়। কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হয়রানি না করে তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনাই এ কার্যক্রমের লক্ষ্য।
অন্যদিকে, এসআরবির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এমজেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানিয়েছেন, শিল্পাঞ্চলে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে গত দুই মাসে চাঁদাবাজির মামলায় ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সন্ত্রাসী ও ছিনতাইকারী দমনেও নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।
তবে নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্পসমৃদ্ধ অঞ্চলে চাঁদাবাজ ও আলোচিত সন্ত্রাসীর তালিকায় সর্বোচ্চসংখ্যক নাম থাকার প্রেক্ষাপটে শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তার নয়, অপরাধের নেপথ্যে থাকা চক্র শনাক্ত, অর্থের উৎস অনুসন্ধান, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। তালিকাভুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাই করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা গেলে শিল্পাঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব হবে।